×
সাতক্ষীরা জেলার উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান

কপোতাক্ষ নদ সাতক্ষীরার দর্শনীয় নলতা শরীফ ঐতিহাসিক গির্জা গুনাকরকাটি মাজার জোড়া শিবমন্দির তেঁতুলিয়া জামে মসজিদ শ্যামসুন্দর মন্দির সোনাবাড়িয়া মঠ মন্দির লিমপিড বোটানিক্যার গার্ডেন রুপসী দেবহাটা ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্র ঐতিহাসিক বনবিবি বটতলা দেবহাটা জমিদার বাড়ী টাকীর ঘাট (ভারত বাংলাদেশ সীমান্ত চিহ্নিত ইছামতি নদীর তীরে) ভারত বাংলাদেশ সীমান্ত চিহ্নিত ইছামতি নদী মোজাফফর গার্ডেন এন্ড রিসোর্ট মান্দারবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত সাত্তার মোড়লের স্বপ্নবাড়ি প্রবাজপুর মসজিদ সাতক্ষীরার গুড়পুকুরের মেলা ঈশ্বরীপুর হাম্মাম খানা/ হাবসিখানা রায় বাহাদুর হরিচরণ চৌধুরীর জমিদার বাড়ি রেজওয়ান জমিদারের বাড়ি ও তেতুলিয়া শাহী মসজিদ বনবিবির বটগাছ আকাশলীনা ইকো ট্যুরিজম সেন্টার খান বাহাদুর কাজী সালামতুল্লা শাহী জামে মসজিদ সুকান্ত ঘোষ স্মরণে স্মৃতিসৌধ
☰ সাতক্ষীরা জেলার উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান
রায় বাহাদুর হরিচরণ চৌধুরীর জমিদার বাড়ি

পরিচিতি

সাতক্ষীরা একটি পুরাতন জনপদ, এই জেলায় রয়েছে অনেক পুরাতন জমিদার বাড়ি। দক্ষিণবঙ্গের প্রতাপশালী শাসক রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজধানী ছিল সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগরের ধুমঘাট এলাকায়। তাঁর রাজত্বের প্রায় ২৫০ বছর পরে জমিদার রায় বাহাদুর হরিচরণ চৌধুরী শ্যামনগরের নকিপুরে একছত্র অধিপতি ছিলেন। রাজা প্রতাপাদিত্যের পরে হরিচরণ রায় ছিলেন শ্যামনগর অঞ্চলের প্রভাবশালী ও বিত্তশালী জমিদার। তাঁর উদ্যোগে শ্যামনগরে তথা সমগ্র সাতক্ষীরায় অনেক জনহিতকর কাজ হয়েছিল। তাঁর সময়ে খনিত হয় অনেক জলাশয়। নির্মিত হয় অনেক রাস্তাঘাট, রোপিত হয় অনেক বৃক্ষ। অনেক জমিদারের মতো হরিচরণ রায় শুধু সম্পদ ও বিলাসে মত্ত না থেকে চেষ্টা করেছিলেন এলাকার মানুষকে শিক্ষিত করতে। তাঁর প্রত্যক্ষ সাহায্যে ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত হয়েছিল নকিপুর মাইনর স্কুলটি। যেটি বর্তমানে নকিপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় নামে খ্যাত। শ্যামনগর অঞ্চলের শিক্ষা প্রসারের অগ্রদুত জমিদার - রাজা হরিচরণ রায় চৌধুরীর জমিদারী ভবনের কিছু ভগ্নাংশ এখনো অবশিষ্ট আছে, এটিই লোকমুখে জমিদার বাড়ি নামেই পরিচিত। ১৮৬০ সালে বাবু হরিচরণ রায় বাহাদুর এই জমিদার বাড়ি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তিনতলা এই জমিদার বাড়িতে ছিল সর্বমোট ৪১ টি কক্ষ।

অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও লেখক চারু চন্দ্র মন্ডলের লেখা একটি বই থেকে জানা যায়, জমিদার রায় বাহাদুর হরিচরণ চৌধুরীর বাড়ীটি ছিল সাড়ে তিন বিঘা জমির উপর। যার বাউন্ডারীটি ছিল প্রায় দেড় হাত চওড়া প্রাচীর দ্বারা সীমাবদ্ধ। সদর পথে ছিল একটি বড় গেট বা সিংহদ্বার। সম্মুখে ছিল একটি শান বাঁধানো বড় পুকুর। শতাধিককাল পূর্বে খননকৃত এই পুকুরটিতে সারাবছরই জল থাকে এবং গ্রীষ্মের দিনে প্রচন্ড তাপদাহে তা শুকায় না। পুকুরঘাটের বাম পাশে ছত্রিশ ইঞ্চি সিঁড়ি বিশিষ্ট দ্বিতল নহবত খানা। আটটি স্তম্ভ বিশিষ্ট এই নহবত খানার ধ্বংসাবশেষটি এখনও প্রায় অক্ষত অবস্থায় দন্ডায়মান থেকে কালের স্বাক্ষী বহন করছে। বাগান বাড়িসহ মোট বার বিঘা জমির উপর জমিদার বাড়িটি প্রতিষ্ঠিত ছিল। বাড়িটি ছিল সত্তর গজ লম্বা, তিন তলা বিশিষ্ট ভবন। সদর দরজা দিয়ে ঢুকতেই সম্মুখে সিঁড়ির ঘর। নিচের তলায় অফিসাদি ও নানা দেবদেবীর পূজার ঘর, এছাড়া আরও দুইটি গমনাগমন সিঁড়ি পথ।

মাঝের তলায় কুল দেবতা গোপাল দেবের মন্দির ও অতিথি শালা। সিঁড়ির দু’পাশে কক্ষ ছিল এবং সিঁড়ি ছিল মধ্যবর্তী স্থানে। সদর অন্দরের দুই পাশেই বারান্দা ছিল। বারান্দাগুলি বেশ প্রশস্ত আট ফুট চওড়া। বিল্ডিং এর নীচে আন্ডারগ্রাউন্ড ছিল। সেগুলি ভাড়ার ঘর হিসাবে ব্যবহার করা হতো। নিচের তলায় ১৭টি এবং উপরের তলায় ৫টি কক্ষ ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। ছোট, বড়, মাঝারি সব রকমের কক্ষ ছিল। বিল্ডিংটির দৈর্ঘ্য ২১০ ফুট, প্রস্থ ৩৭ ফুট, পুন: ৬৪ ফুটের মাথায় এল প্যাটানের বাড়ি। প্রথমবার ঢুকলে কোন দিকে বহির্গমন পথ তা বোঝা বেশ কষ্টদায়ক ছিল। চন্দন কাঠের খাট-পালঙ্ক, শাল, সেগুন, লৌহ কাষ্ঠের দরজা-জানালা ও বর্গাদি, লোহার কড়ি, ১০ ইঞ্চি পুরু চুন-সুরকির ছাঁদ, ভিতরে কক্ষে কক্ষে গদি তোষক, কার্পেট বিছানো মেঝে, এক

কথায় জমিদার পরিবেশ, যেখানে যেমনটি হওয়া দরকার তার কোন ঘাটতি ছিল না। বাড়িতে ঢুকতে ৪টি গেট ছিল। গেট ৪টি ছিল ২০ ফুট অন্তর। জমিদার বাড়ির দক্ষিণে একটি বড় পুকুর ছিল। ১৯৫৪ সালে জমিদার পরিবার এখান থেকে স্ব- পরিবারে ভারতে চলে যায় (অন্য একটি ডকুমেন্টে দেখা যায় ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় জমিদার স্ব-পরিবারে কোলকাতা চলে যান)। বর্তমানে খুবই জরাজীর্ণ অবস্থা জমিদার বাড়িটির। এই জমিদার বাড়ির একটি অলৌকিক কাহিনী রহেছে, জমিদার হরিচরনের মা নিস্তারিণী প্রায় সময় স্বপ্নে বস্তা বস্তা টাকা, বা গুপ্তধন পেতেন।সেই টাঁকা দিয়ে হরিচরণ কিনেছিলেন ১৪ টি চৌহদ্দি, এক চৌহদ্দি সমান দুই থেকে আড়াই হাজার বিঘা, সুর্যাস্থ আইনে এসব জমি কেনা হতো। আইনটি হল নিলামে ওঠার টাঁকা সুর্যাস্থের আগে যে পরিষোধ করতে পারতো চোহর্দি তাঁর হয়ে যেত। প্রজাদের উৎপাদিত ধান রাখার জন্য জমিদার বাড়ির সামনে ছিল ৪০০ টি গোলা, এই জমিদার এতোটায় ধনী ছিলেন যে তিনি তার মাকে ঘুমাতে মানা করতেন, যেন তিনি আর টাকার স্বপ্ন না দেখেন।


পর্যটকদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারতো এমন অনিন্দ্য সুন্দর ঐতিহাসিক স্থাপত্যের বসতবাড়িটি আজ সংস্কার ও দূরদর্শীতার অভাবে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। নান্দনিকতা ও ঐতিহ্যের চরম অবহেলা বলে মনে করেন স্থানীয় ও বিশিষ্টজনেরা। আশেপাশের ২/৩ কিলোমিটার এর ভিতরে আরো অনেক দেখার স্থান রয়েছে সেগুলো হলো >অভিনেতা জয়ন্ত চট্টোপাধ্যয় এর বসতিভিটা >যশোরেশ্বরি মন্দির >বংশিপুর শাহী মসজিদ >ইশ্বরীপুর হাম্মাম খানা


অবস্থান ও যাতায়াত

শামনগর উপজেলা, সাতক্ষীরা। শ্যামপুর থেকে ১ কিলোমিটার দক্ষিণে, নওয়াবেকি যাওয়ার পথে নকিপুরের হরিচরণ জমিদার বাড়ি। ঢাকার শ্যামলী অথবা গাবতলি থেকে সরাসরি বাসে করে সড়কপথে ৮/৯ ঘণ্টায় সাতক্ষীরায় পৌছাতে পারবেন। সাতক্ষীরা শহরে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে অল্প ভাড়ায় ভ্যানে/অটোতে করে চলাচল করতে পারবেন। যে কোন জায়গা থেকে কালিগঞ্জ-শ্যামনগর আসবেন। তারপরে ভ্যানে চড়ে জমিদার বাড়ি। শ্যামনগর বাস স্ট্যান্ডে নেমে ভ্যান/রিক্সা কিছু নিয়ে চলে যেতে পারবেন, ২ কিমি দূরে, জমিদার বাড়ী বললেই হবে। তবে, জমিদারবাড়িতে পায়ে হেঁটে যাওয়াই ভাল এতে করে সবকিছু ভাল করে দেখতে পারবেন।


Total Site Views: 848238 | Online: 4