×
কুমিল্লা জেলার উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান

বায়তুল আজগর জামে মসজিদ নূর মানিকচর জামে মসজিদ কবি তীর্থ দৌলতপুর গোমতী নদী ময়নামতি ওয়ার সেমেট্রি ধর্মসাগর দিঘি বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী, বার্ড, কুমিল্লা রানী ময়নামতির প্রাসাদ বাখরাবাদ গ্যাস ফিল্ড কুমিল্লার জাহাপুর জমিদার বাড়ি রাজেশপুর বন বিভাগের পিকনিক স্পট নবাব ফয়জুন্নেছার পৈতৃক বাড়ি বিজয়পুরের মৃৎশিল্প লালমাই পাহাড় মহাতীর্থ, চন্ডীমুড়া মন্দির শালবন বৌদ্ধ বিহার ময়নামতি জাদুঘর নব শালবন বিহার বীরচন্দ্র গণপাঠাগার ও নগর মিলনায়তন রূপবান মুড়া ও বিহার ইটাখোলা মুড়া ৪০০ বছরের পুরোনো জগন্নাথ দেবের মন্দির
☰ কুমিল্লা জেলার উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান
মহাতীর্থ, চন্ডীমুড়া মন্দির

পরিচিতি

চন্ডীমুড়া মন্দির কুমিল্লার অন্যতম একটি দর্শনীয় স্থান। চণ্ডীমুড়ায় ২টি মন্দির পাশাপাশি অবস্থিত। চণ্ডীমুড়ার উচ্চতা প্রায় ১৫০ ফুটের উপরে। এর চূড়ায় অবস্থিত এই মন্দির। নিচ থেকে এতে উঠতে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৮০টি সিঁড়ি আছে।

কুমিল্লা জেলার ইতিহাস গ্রন্থ থেকে জানা যায়, লালমাই পাহাড়ের বয়স সাড়ে তিন কোটি বছর। এই ময়নামতি লালমাই পাহাড় পূর্বে রোহিতগিরি বা লোহিতগিরি পর্বত নামে পরিচিত ছিলো।উত্তর দক্ষিণে এই পাহাড়শ্রেনী লম্বায়১২ মাইল দীর্ঘ এবং প্রস্থে ৩ মাইল।পাহাড় গুলির গড় উচ্চতা ৫০ ফুট।সর্বোচ্চ উঁচু পাহাড়টির উচ্চতা ১৭২ ফুট।১৬৩ ধাপ সিড়ি অতিক্রম করে এ পাহাড়ের শীর্ষদেশে ২ একর ৬৮ শতক জায়গা জুড়ে ঐতিহাসিক মহাতীর্থ চন্ডীমুড়া মন্দিরের অবস্থান যা আমাদের কুমিল্লার লাকসাম,বরুড়া ও সদর দক্ষিণ উপজেলার ত্রিমুখী সীমান্তস্থলে লালমাই এর উত্তর দক্ষিন প্রান্তে।এখানে চন্ডি ও শিব দুটি মন্দির রয়েছে।চন্ডিমন্দিরের নামানুসারে এলাকাটি চন্ডিমুড়া হিসেবে পরিচিত।চন্ডি মন্দিরদ্বয় ১৩শ’ বছরের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী।মন্দিরের আয়তন ১৮×২৪ ফুট ও উচ্চতা ৪৫ ফুট৷মন্দিরের গঠনপ্রনালী বেশ কৌতূহলোদ্দীপক।দুইটা মন্দিরেরই সামনের অংশের পিছনে বর্ধিত অংশ রয়েছে যা দেখতে ছোট অংশটার মতই এবং গায়ে গায়ে লাগানো। মন্দিরের পাশেই স্বামী আত্মানন্দ গিরি মহারাজের নামে একটা ভবনের নামকরণ করা হয়েছে।

কথিত আছে প্রাচীনকালে বিন্দাচল পর্বতে মহামায়া চণ্ডীরূপে স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল নিপীড়নকারী শন্ডু নিশন্ডু নামক এক মহাসুরকে নিধনকল্পে ঘোরতর যুদ্ধে নামেন।সে যুদ্ধে বেশ কিছু অসুর ঘন জঙ্গলে আবৃত লমলম সাগরের এই দুর্গম দ্বীপে পালিয়ে আসে। অসুরদের সাথে যুদ্ধকালীন সময়ে ভগবতি ক্রোধান্বিত হয়ে বায়ুবেগে চন্ডীরুপে উগ্রমুর্তি ধারন করে এই পাহাড়ে লুকায়িত অসুরদের নিধন করেন৷দেবীর দেহতাপে পাহাড়টির মাটি লাল হয়ে যায়।মাটি লাল হয়ে যাওয়ায় এর নাম পরিবর্তন হয়ে লালমাই পাহাড় নামে পরিচিতি হয়।সে বিশ্বাস থেকেই এ পাহাড়ে হাজার বছর ধরে ছড়িয়ে থাকা মৃত ফসিলগুলো পরিচিতি পেয়েছে "অসুরের হাড্ডী" নামে।

মন্দিরের পাদদেশে মন্দিরের ইতিহাস সম্বলিত যে বোর্ডটি রয়েছে তার প্রথম কাহিনী অনুসারে,সপ্তম শতাব্দীতে এদেশে বৌদ্ধ ও হিন্দু সনাতন সংস্কৃতি প্রায় একই সময়ে পাশাপাশি অবস্থান করছিল।খড়গ বংশীয় বৌদ্ধ রাজাদের প্রদত্ত “আশ্রাফপুর তাম্রফলক” উৎকীর্ন লেখামালা হতে জানা যায় যে,বৌদ্ধরাজ দেবখড়গ এর মহীয়সী রানী “প্রভাবতী” ছিলেন জন্মগতভাবে হিন্দু বংশোদ্ভুত।তিনি ছিলেন আথ্যাত্মিক বিদুষী রমনী।যেখানে দেবী চন্ডির পাদস্পর্শে অসুর নিধন হয়েছিল সেখানেই রানীর ইচ্ছানুসারে মহারাজা শ্রী শ্রী চন্ডী মন্দির স্থাপন করে দেন।চণ্ডী মন্দিরে অষ্টভুজা সর্বাণী মহা সরস্বতী, অপরটিতে শিবমূর্তি স্থাপন করেন।তিনি বৌদ্ধ হয়েও অষ্টভূজা শর্বানী চন্ডীর পূজা করতেন।

প্রভাবতী দেবী দীর্ঘদিন এই মন্দিরে পূজা অর্চনা চালিয়ে গিয়েছিলেন।তাঁর মৃত্যুর পর থেকে এই মন্দিরের ব্যবহার কমতে কমতে একসময় পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে।

১৭শ শতাব্দীতে ধ্বংস হয়ে যাওয়া মন্দিরকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন দ্বিতীয়া দেবী৷ তিনি ছিলেন তখনকার ত্রিপুরা রাজা গোবিন্দ মানিক্যের অগ্রজ জগন্নাথ দেবের দুহিতা যুবরাজ চম্পক রায় এর ভগ্নি৷দ্বিতীয়া দেবী পূজা অর্চনা আর ভক্তদের জন্য চণ্ডীমুড়া পাহাড়ের দক্ষিণ পাদদেশে এক বিশাল দিঘী খনন করেন যা বর্তমানে দুতিয়ার দিঘী নামে পরিচিত৷এর উল্লেখ আছে ত্রিপুরা স্মৃতিগ্রন্থ এবং রাজমালা মানিক্য খন্ডে উল্লেখ আছে এভাবে।

চম্পক রায় দেওয়ান ছিল, হইল যুবরাজ।

তাঁর ভগ্নী দ্বিতীয়া নামে করে পুণ্যকাজ।

মেহেরকুল উদয়পুর দিঘিকা খনিল।

দউলসেতু চণ্ডীমুড়ার চণ্ডিকা স্থাপিল।

কালচক্রে আবার দীর্ঘদিন মন্দির দুইটি সেবক ও ভক্তের অভাবে পরিত্যক্ত হয়।১৩২৫ বঙ্গাব্দে চাঁদপুর নিবাসী বাবু নিবারণ চক্রবর্তী,কুমিল্লার দানবীর মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্যের সহায়তায় পুনরায় ধাতুনির্মিত অষ্টভুজা চণ্ডীমূর্তি স্থাপন করে মন্দিরে পূজা অর্চনার কাজ আরম্ভ করেন।১৯১৯ সালে ধাতুনির্মিত মূর্তিটি চুরি হয়ে যাওয়ার পর থেকে সুদীর্ঘ সময় মন্দিরটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পরে।তখন মন্দিরের অনেক সম্পত্তিই বেদখল হয়ে যায়।স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে বর্তমান সেবাইত স্বামী আত্মানন্দ গিরি মহারাজ এই মন্দিরে আসেন।তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমে আবারও মন্দিরে পূজা অর্চনা শুরু হয় যা এখনও চালু আছে। (তথ্যসুত্র: শ্রী শ্রী গীতা পরিষদ বাংলাদেশ)।

প্রতি বছর তিনবার চণ্ডীমুড়ায় ভক্তদের সমাবেশ ঘটে।কার্তিক মাসের কালীপূজার সময় দেওয়ানি উৎসব, পৌষ-মাঘ মাসে গীতা সম্মেলন এবং ফালগুন-চৈত্র মাসে বাসন্তী মহাঅষ্টমী।

১৯৫৫/৫৬ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ লালমাই-ময়নামতিতে জরিপ চালিয়ে কুমিল্লার প্রত্নতাত্তিক যে ৫৪টি স্থান সংরক্ষণের জন্য চিহ্নিত করে তার মধ্যে চণ্ডীমুড়া অন্যতম।

 

অবস্থান ও যাতায়াত

কুমিল্লার লাকসাম, বরুড়া ও সদর দক্ষিণ উপজেলার ত্রিমুখী সীমান্তস্থলে লালমাই এর উত্তর দক্ষিন প্রান্তে।

জেলা সদর থেকে মাত্র ৪০ মিনিটের মধ্যে এ মন্দিরে যাওয়া যায়। কুমিল্লা সদর থেকে প্রায় ১৪-১৫ কিলোমিটার দক্ষিনে, কুমিল্লা চাদপুর মহাসড়কের পাশে লালমাই পাহাড়ের দক্ষিণ অংশে এর অবস্থান। চন্ডীমুড়া যেতে প্রথমে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড হয়ে লালমাই বাজার পৌছতে হবে। সেখান থেকে অটো, সিএনজি চেপে পৌছে যাবেন মন্দিরে।


Total Site Views: 1079880 | Online: 8