×
কুমিল্লা জেলার উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান

বায়তুল আজগর জামে মসজিদ নূর মানিকচর জামে মসজিদ কবি তীর্থ দৌলতপুর গোমতী নদী ময়নামতি ওয়ার সেমেট্রি ধর্মসাগর দিঘি বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী, বার্ড, কুমিল্লা রানী ময়নামতির প্রাসাদ বাখরাবাদ গ্যাস ফিল্ড কুমিল্লার জাহাপুর জমিদার বাড়ি রাজেশপুর বন বিভাগের পিকনিক স্পট নবাব ফয়জুন্নেছার পৈতৃক বাড়ি বিজয়পুরের মৃৎশিল্প লালমাই পাহাড় মহাতীর্থ, চন্ডীমুড়া মন্দির শালবন বৌদ্ধ বিহার ময়নামতি জাদুঘর নব শালবন বিহার বীরচন্দ্র গণপাঠাগার ও নগর মিলনায়তন রূপবান মুড়া ও বিহার ইটাখোলা মুড়া ৪০০ বছরের পুরোনো জগন্নাথ দেবের মন্দির
☰ কুমিল্লা জেলার উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান
লালমাই পাহাড়

পরিচিতি

বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলার লালমাই উপজেলায় অবস্থিত একটি বিচ্ছিন্ন পর্বতশ্রেণী। প্রায় পঁচিশ লক্ষ বছর আগে প্লাইস্টোসিন যুগে এই পাহাড় গঠিত হয়েছিল বলে অনুমান করা হয়। সে হিসেবে এটি বাংলাদেশের বরেন্দ্রভূমি এবং মধুপুর ও ভাওয়াল গড়ের সমকালীন।

লালমাই পাহাড় নিয়ে কয়েকটি গল্প প্রচলিত আছে।

একটি গল্প এরকম- লংকার রাজা রাবণ রামের স্ত্রী সীতাকে হরণ করে নিয়ে গেলে রাম তার ভাই লক্ষণকে নিয়ে উদ্ধার অভিযান চালায়। এতে লক্ষণ আহত হলে কবিরাজ বিশল্যাকরণী গাছের পাতা হিমালয় পাহাড় থেকে সূর্যোদয়ের পূর্বে এনে দেয়ার কথা বলেন। হনুমান গাছটি চিনতে না পেরে পুরো পর্বত নিয়ে আসে এবং কাজ শেষে পাহাড়টি যথাস্থানে রাখতে যাওয়ার সময় অনেকটা আনমনা হয়ে যায়। ফলে পাহাড়ের একাংশ লম লম সাগরে পড়ে যায়। হিমালয়ের সেই ভেঙ্গে পড়া অংশই বর্তমানের লালমাই পাহাড়।

আর একটি গল্প হলো- এক রাজার দুই মেয়ে ছিলো। একজন লালমতি আরেকজন ময়নামতি। তাদের নাম থেকে আজকের লালমাই ও ময়নামতি পাহাড়।

এ পাহাড়ের নামকরনের পেছনে একটি পৌরাণিক কাহিনীও চালু আছে। বলা হয় প্রাচীনকালে বিন্দাচল পর্বতে মহামায়া চন্ডী মহাসুর সতী রূপে স্বর্গ মর্ত পাতাল নিপীড়নকারী শন্ডু নিশন্ডু নামক এক মহাসুরকে নিধনকল্পে এক ঘোরতর যুদ্ধে নামেন। সে যুদ্ধে বেশ কিছু অসুর ঘন রথ জঙ্গলে আবৃত এ দুর্গম দ্বীপে পালিয়ে আসেন। মা মহামায়া তখন প্রবল ক্রোধান্বিত হয়ে বায়ুবেগে এ দুর্গম দ্বীপে পাহাড়ের কোলে আশ্রয় নেওয়া অসুরদের নিধন করেন। মায়ের দেহতাপে পাহাড়টির মাটি লাল হয়ে যায়। কিন্তু মাটি লাল হয়ে যাওয়ায় এর নাম পরিবর্তন হয়ে লালমাই পাহাড় নামে পরিচিতি পায়।

এ সব নেহায়েতই গল্প হতে পারে। সম্পূর্ণ লাল মাটির লালমাই পাহাড়টি উত্তর-দক্ষিণে ১২ মাইল লম্বা এবং পূর্ব-পশ্চিমে ৩ মাইল চওড়া। পাহাড়টির সর্বোচ্চ উচ্চতা ৫০ ফুট।

কোথাও পাহাড়ের মাথা জুড়ে সবুজ, কোথাও ন্যাড়া। এ পাহাড়ের মাটি লাল বলে এর নাম লালমাই পাহাড়। কুমিল্লা সদর, সদর দক্ষিণ ও বরুড়া উপজেলা জুড়ে লালমাই পাহাড়। এ পাহাড়ে রয়েছে অপার সমৃদ্ধির হাতছানি। এখানে পতিত জমিতে চাষ হতে পারে কমলা। এখন চাষ হচ্ছে করলা, সিম, কচু, কাঠ আলুসহ নানা ধরনের সবজি। লালমাই পাহাড়ের উঁচু-নিচু টিলার চূড়া, ঢাল ও টিলার ফাঁকে ফাঁকে, পাহাড়ের পাদদেশে ও আশপাশের সমতল ভূমিতে গাছে গাছে প্রচুর কাঁঠাল ধরে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাটির গঠন অনুযায়ী প্রাচীন এ জনপদে অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসতে পারে তেল গ্যাসের মতো খনিজ সম্পদ।

লালমাই বাজার থেকে পশ্চিম দিকে একটু হেঁটে গেলেই দেখতে পাবেন সবুজ গাছ-গাছালি ঘেরা লালমাই আঞ্চলিক স্বাউট প্রশিক্ষন কেন্দ্র। এবার উত্তর দিকে ইটের সলিং করা সড়ক ধরে হাটুন টাঙ্কু টিলা এলাকায় প্রায় দেড় কি.মি পথ। দুপাশে সারি সারি কাছগাছ আর লালমাটির তৈরি করা সড়কটির উঁচু নিচু স্থান অতিক্রম করার আনন্দটাই আলাদা।

টাঙ্কু টিলাটি সমতল ভূমি থেকে প্রায় ২০০ ফুট উপরে। এ টিলার উপর পাওয়া গেছে গ্যাসক্ষেত্র। আর এর নামকরন করা হয়েছে লালমাই গ্যাস। এটি এখনো চালু করা হয়নি, না করা হলেও উত্তোলন করে জ্বালিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। পাহাড়ের মাথা কেটে সমান করে কূপের এলাকাজুড়ে নিরাপত্তা বেষ্টণী দেওয়া হয়েছে। আপনি ভেতরে ঢুকতে পারবে না। তবে চারিদিক ঘুরে দেখতে পারেন। ছবি তুলতে পারেন। পাহাড়ের উপর গ্যাসফিল্ড কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য চায়ের স্টল রয়েছে। ইচ্ছা করলে চা পানের সঙ্গে একটু বিশ্রাম নিতে পারেন । তবে বেশী দেরি করবেন না। গ্যাসক্ষেত্রের টিলার ১০০ ফুট দক্ষিণে সমতল ভূমিতে রয়েছে কেরোসিন তেলের খনি। অবশ্য এখন আর এখান থেকে তেল উত্তোলিত হয় না। স্বাধীনতার আগে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তেলের মূল কূপের মুখে সীসা ও অন্যান্য ধাতব পদার্থের মাধ্যমে এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে এখনো রয়েছে কূপের অবস্থান, রিজার্ভ টাংকি ইত্যাদি।

এবার চলে আসুন আবার বালুপথ মাড়িয়ে গেলেই হাতের ডানপাশে নজরে আসবে ক্ষতবিক্ষত একটি পাহাড়। এটি হচ্ছে লালমাই ফায়ারিং স্পট। এখানে বাংলাদেশ পুলিশ, আনসার,ভিডিপি সদস্যদের অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষন দেওয়া হয়। আপনি ঘুরে দেখতে পাবেন পাহাড়ের গায়ে বিধে আছে অজস্র গুলির অংশ। পাহাড়টির ওপরে উঠলে দেখতে পাবেন ছোট বড় অসখ্য টিলা আর দানব অসুরের হাড়ের বিরাট বিরাট অংশ মাটির সঙ্গে মিশে আছে। ইচ্ছে করলে পাহাড়ি পথ ধরে হাঁটতে পারেন। তবে বেশিদূর যাবেন না। লোকলয়ের বাইরে ছিনতাইকারীর ভয় রয়েছে। পাহাড়ের পাশে বাড়িগুলোতে অসংখ্য বাঁশঝাড়। এ বাঁশঝাড়ে চড়ুই পাখির কিছির মিচির শব্দে আপনি মোহিত হবেন। পাহাড়ে উঠানামা করতে সাবধানতা অবলম্বন করবেন। নতুবা পা ফসকে পড়তে পারেন। এবার ফায়ারিং স্পট থেকে দক্ষিনে দিকে পাহাড় কাটা রাস্তা হয়ে ১ হাজার ফুট অতিক্রম করে এলেই দেখতে পবেন সামনে চাঁদপুর মহাসড়ক। বাম পাশে লালমাই বাংলাদেশ বেতার কেন্দ্র এবং ডান পাশে লোটাস কামাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক। আপনি চাঁদপুর মহাসড়ক ধরে ১ হাজার ৫০০ ফুট পশ্চিমে বরুড়া সড়ক ধরে গেলে দেখতৈ পাবেন লালমাই পাহাড়ের প্রায় ৩০০ ফুট উপরে হিন্দু সম্প্রদায়ের তীর্থস্থান চন্ডীমুড়া মন্দির।

লালমাই পাহাড়েরই একটি স্থানের নাম সালমানপুর। এই সালমানপুরেই ২০০৬ সালে চালু হয় ঐতিহ্যবাহী কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। একই এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সিসিএন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটও। এখানে রয়েছে শালবন বিহার। পূর্বে এই প্রত্নস্থানটি ‘শালবন রাজাবাড়ি’ নামে পরিচিত ছিল। এর আসল নাম ‘ভবদেব মহাবিহার’। এই বিহারটি খননে পাওয়া গেছে বিপুল পরিমাণ প্রত্নবস্তু, যা এখন ময়নামতি জাদুঘরে শোভা পাচ্ছে। রয়েছে ময়নামতি বৌদ্ধবিহার। এখানে অষ্টম শতকের পুরাকীর্তি রয়েছে। এখানকার বিভিন্ন স্পটের মধ্যে শালবন বিহার ও বৌদ্ধ বিহার অন্যতম। ৩ বৌদ্ধ বিহার থেকে ৩ মাইল উত্তরে দেখতে পাবেন কুটিলামুড়া ও রূপবান মুড়া। এরও উত্তর-পশ্চিমে কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় অবস্থিত চারপত্র মুড়া। এখানে বনবিভাগ ২টি পিকনিক স্পট চালু করেছে।

 

অবস্থান ও যাতায়াত

এ স্থানে যেতে সড়কপথের যোগাযোগই ভালো। ঢাকা-চট্টগ্রাম-নোয়াখালী-চাঁদপুর রেলপথে লালমাই স্টেশন থাকলেও এখানে আন্তঃনগর এক্সপ্রেস ট্রেনের কোন বিরতি নেই। আর তাই ঢাকা-চট্রগ্রাম, ঢাকা-চাঁদপুর বাসযোগে এসে লালমাই বাজারে নামতে হবে।


Total Site Views: 1079866 | Online: 10