×
খাগড়াছড়ি জেলার উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান

আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র আলুটিলার ঝর্ণা বা রিছাং ঝর্ণা আলুটিলার সুড়ঙ্গ বা রহস্যময় সুড়ঙ্গ দেবতার পুকুর (দেবতার লেক) শান্তিপুর অরণ্য কুটির বনভান্তের প্রথম সাধনা স্থলে দীঘিনালা বনবিহার বিজিবি জন্মস্থানের স্মৃতিসৌধ মাটিরাঙার উপজেলার শতবর্ষী বটগাছ মাটিরাঙ্গায় বিনোদন পার্ক “জল পাহাড়” মানিকছড়িতে মং সার্কেলের রাজবাড়ি রামগড়ে শহীদ ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের বীর উত্তম এর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি ও কবর রামগড়-সাব্রুম স্থলবন্দর (নির্মাণাধীন) বিজিবি জন্ম স্থান, চা বাগান, ঝুলন্ত ব্রি্‌জ, লেক ও ভারত সীমান্তে রামগড় একদিনে ভ্রমন
☰ খাগড়াছড়ি জেলার উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান
রামগড়ে শহীদ ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের বীর উত্তম এর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি ও কবর

পরিচিতি

“একটি পাকিস্তানি সৈন্যকে খতম করার অর্থ হচ্ছে এদেশের অন্তত এক লক্ষ নরনারীকে মৃত্যূ অথবা নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করা।”, অধিনস্থ সৈন্যদের উজ্জীবিত করতে একথাটি প্রায় বলতেন ক্যাপ্টেন আফতাব কাদের। বড় ক্ষোভ ছিল তার মনে পাকিস্তানীদের প্রতি। থাকবে নাই বা কেন? যে সেনাবাহিনী নিজ দেশের মানুষের উপর এমন গণহত্যা চালাতে পারে তাদের প্রতি এমন আক্রোশ না থেকে কি উপায় আছে? খালাতো বোন জুঁইকে ভালোবাসতেন ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের। জুঁইও তাঁকে ভালোবাসতেন। তাঁরা বিয়ে করবেন—নানা জটিলতা বিশেষত, সেনা চাকরির কারণে আফতাবুল কাদের সময় ও সুযোগ করে উঠতে পারছিলেন না। চাকরি করতেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে। কর্মরত ছিলেন পাকিস্তানের (তখন পশ্চিম পাকিস্তান) হায়দরাবাদে, ফিল্ড রেজিমেন্টে। অবশেষে তাঁর সেই সুযোগ হলো ১৯৭১ সালে। সে সময় ছুটি নিয়ে ঢাকায় আসেন। ২০ মার্চ চট্টগ্রামে রেজিস্ট্রি বিয়ে হয় তাঁদের। কয়েক দিন পর আনুষ্ঠানিক জীবন শুরু করবেন তাঁরা, এমন সময় দেশে নেমে এল চরম দুর্যোগ—২৫ মার্চের কালরাত। সেদিন তিনি ঢাকাতেই ছিলেন। ফরিদাবাদে ছিল তাঁর মা-বাবার বাসা। দেশ মাতৃকার টানে প্রতিশোধপারায়ণ কাদের বেরিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের উদ্দেশ্যে। বিয়ের মাত্র একমাস পার না হতেই এই বীর সেনানী নিজ পরিবারের মায়া ত্যাগ করে শুরু করেন এক অনির্দিষ্ট পথে যাত্রা। লক্ষ্য দেশ স্বাধীন করার, দেশকে শত্রু মুক্ত করার। একদিকে নতুন বিবাহিত জীবনের হাতছানি, অন্যদিকে দেশমাতৃকা। দেশের সন্ধিক্ষণে আফতাবুল কাদের বেছে নিলেন দেশমাতৃকাকেই। ২৮ মার্চ ফরিদাবাদের বাসা থেকে বেরিয়ে পড়লেন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে। সেখানে অবরুদ্ধ থাকার সময় স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান এর চট্টগ্রাম বেতারের ২৭ মার্চের ঘোষণা তিনি শুনেছিলেন। বাসা থেকে বেরিয়ে তিনি যান চট্টগ্রামে। রামগড়ে তাঁর দেখা হয় জিয়াউর রহমানের (বীর উত্তম) সঙ্গে। তিনি তাঁকে মহালছড়ি এলাকায় অবস্থানরত প্রতিরোধযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দিতে বলেন। এরপর তিনি সেখানে যান। চট্টগ্রাম তখনো মুক্তাঞ্চল। ঢাকা চটগ্রাম মহাসড়ক জুড়ে বিভিন্ন পজিশনে ক্যাপ্টেন রফিক(পরবর্তীতে মেজর এবং ১ নং সেক্টর কমান্ডার) এর নেতৃত্বে ইপিআর বাহিনী নিয়েছিল শক্ত অবস্থান।’জান দেব,তবু রাস্তা ছড়বো না’ -এই মূলমন্ত্র নিয়ে মাটি কামড়ে প্রতিরক্ষা ব্যুহগুলোতে স্বল্প রসদে লড়ে যাচ্ছিল সেদিন হাজার হাজার ইপিআর। ক্যাপ্টেন কাদির এই ইপিআর সৈন্যদের সাথে ফেণীর শুভপুর প্রতিরক্ষায় যোগ দেন। পাকিস্তানীরা হেলিকাপ্টারের সাহায্যে শুভপুরে সৈন্য নামানোর সময় গ্রামবাসীদের সহায়তায় ধরে ফেলেন একজন সৈন্যকে। পরবর্তীতে তিনি রামগড় ফিরে আসেন। এখানে তিনি ৫০০ জন তরুণকে নিয়ে গড়ে তোলেন একটি মুক্তি ক্যাম্প। এসব তরুণদের তিনি নিজ হাতে প্রশিক্ষন দেওয়া শুরু করেন। ২৪ এপ্রিল ’৭১। এদিন সংবাদ এলো মেজর শওকতের কাছ থেকে। এখনই তাকে মহালছড়িতে ফিরে যাবার নির্দেশ দেয়া হল। নির্দেশ মতো ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের রওয়ানা দিলেন মহালছড়ির উদ্দেশ্যে। বুড়িঘাটে এসে দেখা হল লেফটেন্যান্ট মাহফুজ, ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান, হাবিলদার সায়ীদ এবং হাবিলদার তাহেরসহ আরো অনেকের সাথে। বুড়িঘাট থেকে রওয়ানা হয়ে যখন ক্যাপ্টেন কাদেরদের লঞ্চটি একটি দ্বীপে (কাপ্তাই লেকের মধ্যে পাহাড়গুলোকে দ্বীপের মতোই মনে হয়) এসে ভিড়লো তখনই পাক বাহিনীর একটি ধাবমান লঞ্চ এসে পৌঁছল সেখানে। বন্দুকভাঙ্গায় ক্যাপ্টেন আফতাব এর বাহিনীকে না পেয়ে শত্রুপক্ষ কয়েকটি লঞ্চে করে পুরো লেক এলাকায় তাঁদেরকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। শত্রুপক্ষের অতর্কিত আক্রমণে ক্যাপ্টেন আফতাব এর সদস্যরা এদিক সেদিক ছিটকে পড়ে। শুরু হয় ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত গুলিগোলা বিনিময়। শেষ পর্যন্ত ক্যাপ্টেন আফতাব এর পাশে থেকে যান হাবিলদার সায়ীদ এবং হাবিলদার তাহের। এদের দু’জনের হাতে ছিল এলএমজি। তিনটি এলএমজি’র অনবদ্য গুলি বর্ষণের ফলে শত্রুপক্ষ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে পিছু হটে যায়। এক ঘণ্টা ধরে চলছিল বুড়িঘাটের এই যুদ্ধ। শত্রুপক্ষ পিছু হটে যাবার পর নিজ বাহিনীর সদস্যদেরকে একত্রিত করে মহালছড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন ক্যাপ্টেন আফতাব। সাথে লে. মাহফুজ, ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান আরো কয়েকজন। মুক্তিবাহিনীর অবস্থান তখন সুবিধাজনক ছিল না। উপর্যুপরি বিমান আক্রমণ চলছিল। রামগড় দখলে নেবার জন্যও পাক বাহিনী তখন সর্বাত্মক প্রস্ত্ততি নিচ্ছিল। মহালছড়িতে তখন ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত সেনা দলগুলোকে একত্রিত করার কাজ চলছিল। উদ্দেশ্য শত্রুপক্ষের উপর শেষ আঘাত হানা। এদিকে একের পর এক মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচন্ড হামলার মুখে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পাকবাহিনী তাদের শক্তি বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়। তারা মিজোরামের দু’টি বিদ্রোহী গ্রুপের সদস্যদের নিজ দলে অন্তর্ভুক্ত করতে শুরু করে। অন্যদিকে স্থল আক্রমণের সাথে সাথে বিমান ও হেলিকপ্টারের সাহায্যেও শুরু করা হয় মুক্তিযোদ্ধাদের সম্ভাব্য অবস্থান-ঘাঁটির উপর প্রবল হামলা। এ অবস্থায় পার্বত্য এলাকায় পূর্ব ট্রেনিংবিহীন মুক্তিযোদ্ধারা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। রসদ এবং গোলাবারুদ সংকটও দেখা দেয় তাদের। এই প্রতিকূল ও দুর্বল মুহূর্তে ২৭ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে পাকবাহিনীর দ্বিতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়নের এক কোম্পানি সৈন্য (১৩৬জন) এবং একটি মিজো ব্যাটালিয়নকে (১০০০জন) সঙ্গে নিয়ে আক্রমণ চালায় মহালছড়িতে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের উপর। মেজর মীর মওকত এবং চন্দ্রঘোনা পেপার মিলের প্রকৌশলী ইসহাকের নেতৃত্বে ঐ সময় শত্রম্নদের আক্রমণ প্রতিহত করা হচ্ছিল। এর মধ্যে পাকবাহিনী হেলিকপ্টারযোগে দ্বিতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়নের আরও এক কোম্পানি সৈন্য এখানে নামিয়ে দিয়ে যায়। দুই পক্ষের প্রচন্ড এ যুদ্ধের মধ্যে বেলা তিনটায় ক্যাপ্টেন আফতাব এর নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপটি মহালছড়ি এসে পৌঁছে। অসীম সাহস আর সুদক্ষ যুদ্ধ কৌশল গ্রহণ করে টগবগে তরুণ সেনা অফিসার আফতাব সঙ্গীদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন শত্রু মোকাবিলায়। তাদের এ সম্মিলিত কঠিন প্রতিরোধের মুখে মিজো বাহিনী প্রথম অবস্থায় পিছু হটতে শুরু করে। এতে পাকসেনারা বেপরোয়া হয়ে উঠে। তারা মিজোদের সামনে রেখে একটার পর একটা আক্রমণ চালিয়ে অগ্রসর হতে থাকে। প্রতিবারই মুক্তিযোদ্ধারা পাল্টা জবাব দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করে শত্রুদের। মুক্তিযোদ্ধাদের লক্ষ করে বেপরোয়া গুলি ছুঁতে ছুঁড়তে এগিয়ে যায়। তিন চারগুণ অধিক সংখ্যক শত্রু পক্ষ বীভৎস উল্লাস ধ্বনি দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রায় চারিপাশ থেকে ঘিরে ফেলে। চরম এ বিপজ্জনক অবস্থায় সহযোদ্ধারা পশ্চাদাপসরণের পরামর্শ দেন ক্যাপ্টেন আফতাবকে। কিন্তু অকুতোভয় তেজদীপ্ত বীর সেনানী সহযোদ্ধা ছাত্র শওকত, ফারুক এবং দুই ইপিআর সৈনিককে সঙ্গে নিয়ে তিনটি এলএমজি’র অবিরাম গুলি বৃষ্টি কোণঠাসা করে ফেলে শত্রুদের। এই চরম মুহূর্তে হঠাৎ এক সহযোদ্ধার এলএমজি’র ফায়ারিং বন্ধ হয়ে যায়। শতাধিক মুক্তিযোদ্ধার জীবনকে শত্রুর হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখার তিনটি এলএমজি’র একটি অচল হয়ে পড়ায় অস্থির হয়ে পড়েন ক্যাপ্টেন আফতাব। মেরামতের জন্য দ্রুত অস্ত্রটি তাঁর কাছে নিয়ে আসার নির্দেশের পরও সহযোদ্ধা শওকতের আসতে খানিক দেরি হওয়ায় যুদ্ধরত আফতাব নিজেই ক্রলিং করে এগিয়ে যেতেই শত্রুর অস্ত্রের কয়েকটি গুলি এসে বিঁধে তাঁর ডান বগলের কয়েক ইঞ্চি নিচে এবং পেটের বাম পাশে। গুলিবৃষ্টির মধ্যেই গুরুতর আহত আফতাবকে বহন করে একটু নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসেন শওকত, ফারুক ও ইপিআরের ড্রাইভার আববাস। সেখান থেকে চিকিৎসার জন্য জিপ গাড়িযোগে রামগড় আসার পথে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন বাংলার এ তরুণ বীরযোদ্ধা। ঐদিন শেষ বিকেলে সহযোদ্ধা ফারুক, শওকত (পরবর্তীতে এঁরা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অফিসার হিসেবে কমিশন্ড হন) ও ড্রাইভার আববাস বীর শহিদের মরদেহ নিয়ে রামগড় এসে পৌঁছলে এখানে সকলের মাঝে নেমে আসে শোকের ছায়া। সন্ধ্যার প্রাক্কালে রামগড় কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে ইমাম মাওলানা মোহাম্মদ মোস্তফার পরিচালনায় শহিদ আফতাব এর জানাজা নামাজ শেষে কেন্দ্রীয় কবরস্থানে পূর্ণ সামরিক ও ধর্মীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ অফিসার এবং পরবর্তীতে মরনোত্তর বীর প্রতীক খেতাব প্রাপ্ত হন ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের। দেশের তরে প্রাণ দিলেন এই বীর যোদ্ধা, মৃত্যু যখন তাকে আলিঙ্গন করলো হাতের মেহদীর রং তখনো শুকোয়নি। মৃত্যুর মধ্যে দিয়েই আজ তিনি আমাদের মাঝে অমর। আমরা তাকে ভুলিনি, কারণ প্রকৃত বীর কখনো মরে না।কাদের বেঁচে থাকবেন আমাদের মাঝে আমাদের স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে। (সংগ্রহ-সূত্রঃ বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর ১ ও মোজাম্মেল হক। এবং মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনো https://www.facebook.com/Muktijuddhergolpo/posts/889640077784143:0)


অবস্থান ও যাতায়াত

রামগড় পৌর কবরস্থান, কলেজ রোড, রামগড়, খাগড়াছড়ি। ফেনীর মহিপাল বাস টার্মিনাল থেকে রামগড় ও খাগড়াছড়ির বাস ছাড়ে এবং এবং চট্টগ্রামের অক্সিজেন থেকেও রামগড় ও খাগড়াছড়ির বাস ছেড়ে আসে।চট্ট্রগ্রাম থেকে খাগড়াছড়ির বাস হলে জেলিয়া পাড়া নেমে রামগড় আসা যায়।


Total Site Views: 784292 | Online: 4