×
রাজবাড়ী জেলার উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান

কল্যাণ দীঘি শাহ পাহলেয়ানের মাজার নলিয়া জোড় বাংলা মন্দিরঃ মীর মশাররফ হোসেন স্মৃতিকেন্দ্র স্নানমঞ্চ ও দোলমঞ্চ ডিকে সাহার মন্দির মনু মিয়া ছনু মিয়ার মাজার নীলকুঠি জামাই পাগলের মাজার দাদশি মাজার শরীফ মুকুন্দিয়ায় জমিদার বাড়ীও স্মৃতিচিহ্ন মঠ
☰ রাজবাড়ী জেলার উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান
মীর মশাররফ হোসেন স্মৃতিকেন্দ্র

পরিচিতি

মীর মশাররফ হোসেন উনবিংশ শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ট মুসলিম সাহিত্যিক রুপে খ্যাত ‘বিষাদ সিন্ধুর’ অমর লেখক। তিনি ১৮৪৭ সালের ১৩ই নভেম্বর কুষ্টিয়া শহর থেকে তিন মাইল পূর্বে গড়াই ব্রীজের নিকটস্থ লাহিনীপাড়া গ্রামে ভূ-সম্পত্তির অধিকারী এক ধনাঢ্য পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ছিল মীর মোয়াজ্জ্বেম হোসেন এবং মাতার নাম দৌলতন নেছা। .তার পূর্ব পুরুষ সৈয়দ সা’দুল্লাহ বাগদাদ থেকে প্রথমে দিল্লীতে এসে মোগল সেনা বাহিনীতে চাকুরি করেন। পরে তিনি ফরিদপুর জেলার স্যাকরা গ্রামে আগমন করে এক হিন্দু ব্রাক্ষণ কণ্যার পানি গ্রহণ করে পদমদী গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস আরম্ভ করেন। মীর মশাররফ হোসেনের পিতা মীর মোয়াজ্জম হোসেন কুষ্টিয়ার লাহিনীপাড়া গ্রামের ভূস্বামী ছিলেন। মীর মশাররফ হোসেন বাল্যকালে প্রথম গৃহে, পরে গ্রামের জগমোহন নন্দীর পাঠশালায় লেখাপড়া আরম্ভ করেন। এরপর কুমারখালী এম.এন.স্কুল, কুষ্টিয়া হাই স্কুল ও পদমদী স্কুলে অল্প দিন করে পড়েছিলেন। পরে কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। সম্ভবতঃ অষ্টম শ্রেণীতে উঠে তিনি কলকাতায় পিতৃবন্ধু নাদির হোসেনের বাসায় থেকে কিছুকাল পড়াশুনা করেন। নাদির হোসেনের বাসায় অবস্থানকালে তার প্রথমা সুন্দরী কন্যা লতিফনের সংগে প্রথমে ভালবাসা এবং পরে বিবাহের ব্যবস্থা হয়। কিন্তু বিবাহের সময় নাদির হোসেন প্রথম কন্যার পরিবর্তে দ্বিতীয় কুরুপা ও বুদ্ধিহীনা কন্যা আজিজন্নেসার সংগে তার বিবাহ দেন (১৯মে ১৮৬৫)। এই ঘটনার পরিণামে লতিফন্নেসা আত্মহত্যা করলে মীর ভীষণ আঘাত পান। তিনি তার স্ত্রী আজিজন্নেসাকে ক্ষমা করতে পারেন নাই। মীরের প্রথম বিবাহ সুখের না হওয়ায় বিবাহের আট বছর পর সাঁওতা গ্রামের এক বিধবার কন্যা কালী ওরফে কুলসুম বিবিকে বিবাহ করেন। এই ঘটনায় আজিজন্নেসার সংগে তার মনোমালিন্য আরো তীব্র হয়। অতঃপর মীর মশাররফ হোসেন লাহিনীপাড়ায় বসবাস করতে না পেরে টাঙ্গাইল জেলার গজনবী এষ্টেটের এক তরফে ম্যানেজার হয়ে টাঙ্গাইলের ‘শান্তিকুঞ্জে’ বিবি কুলসুমকে নিয়ে বসবাস করতে থাকেন।

আজিজন্নেসা কয়েক বছর অনাদর অবহেলায় নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করে লাহিনীপাড়ায় মারা যান। তার গর্ভে কোন সন্তান জন্মগ্রহণ করে নি। মীর মশাররফ হোসেনের পাঁচটি পুত্র ও ছয়টি কন্যা সবাই বিবি কুলসুমের গর্ভজাত। মীর মশাররফ হোসেনের সন্তানদের নামঃ রওশন আরা, এক কন্যা (নাম জানা যায় নাই), ইব্রাহীম হোসেন, আমিনা, সালেহা, সালেমা, আশরাফ হোসেন, ওমর দারাজ, মাহবুব হোসেন, রাহেলা ও মোসতাক হোসেন। ১৯১১ সালের ১৯শে ডিসেম্বর পদমদী গ্রামে মীর মশাররফ হোসেন ইনতিকাল করলে বিবি কুলসুমের কবরের পাশেই তাকে সমাহিত করা হয়। মীর মশাররফ হোসেন উনিশ মতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক। তার প্রথম জীবনীকার ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় তাকে বাংলা সাহিত্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সংগে তুলনা করেছেন। মীর মশাররফ হোসেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্রপাধ্যায়ের সংগে তুলিতে হলেও অসঙ্গত হয় না। গদ্যে, পদ্যে, নাটক, নভেলে মীর মশাররফ হোসেন প্রায় ৩৭ খানা গ্রন্থ রচনা করেন। তার গদ্যরীতি ছিল বিশুদ্ধ বাংলা যা তদানীন্তনকালে অনেক বিখ্যাত হিন্দু লেখকও লিখতে পারেন নি।

তবে তার পদ্যনীতি প্রায় সবই অনুকৃতি ও কষ্টকল্প রচনা বলে কোনো সমাদার পায়নি। তিনি ‘জমিদার দর্পন’ নাটক লিখে তদানীন্তনকালে অন্যতম শ্রেষ্ট নাট্যকারের মর্যদা লাভ করেন। এ নাটকখানির কাহিনী, সংলাপ, চরিত্র চিত্রণ ও নাটকীয়তাগুণে দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীল দর্পণের’ চেয়ে অনেকাংশে শ্রেষ্ঠত্ব দাবী করে। কৃষক বিদ্রোহে উস্কানী দেওয়ার ভয়ে বঙ্কিমচন্দ্র ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় নাটকখানির প্রকাশ ও অভিনয় বন্ধের সুপারিশ করেছিলেন।

মীর মশাররফ হোসেন প্রথম জীবনে কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিক’ (১৮৬৩) ও কবি ঈশ্বরগুপ্তের ‘সংবাদ প্রভাকর’ (১৮৩১) পতিকায় টুকিটাকি সংবাদ প্ররণ করতেন। এই সুবাদে কাঙাল হরিনাথের সংগে তার হৃদ্যতা গড়ে উঠেছিল যা আমৃত্যু বহাল থাকে। এ কারণেই মীর মশাররফ হোসেনকে কাঙাল হরিনাথের সাহিত্য শিষ্য বলা হয়েছে। প্রকৃত পক্ষে কাঙাল হরিনাথ মজুমদার মীর মশাররফ হোসেনকে অনুকরণ করার চেষ্টা করেছেন।

মুসলিম সাহিত্যিকদের পথিকৃত মীর মশাররফ হোসেন বিশুদ্ধ বাংলায় অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করে আরবী-ফারসী মিশ্রিত তথাকথিত মুসলমানী বাংলা ভাষা পরিত্যাগ করেছিলেন। মীর মশাররফ হোসেনের সর্বশ্রেষ্ট গ্রন্থ ‘বিষাদ সিন্ধু’ বাংলার মুসলমান সমাজে ধর্মগ্রন্থের মত শ্রদ্ধর সংগে আজও পঠিত হয়। কারবালার করুণ ইতিহাসের উপর ভিত্তি করে রচিত এই উপন্যাসখানি বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ।

মীর মশাররফ হোসেনের অপর গ্রন্থগুলি বাদ দিলেও মাত্র এই একখানি গ্রন্থ রচনার জন্য তাকে বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ট লেখক আখ্যায়িত করা যায়। তাঁর সাহিত্যের প্রায় অর্ধেকই কাব্য হলেও তিনি কবি খ্যাতি লাভ করতে পারেন নি। মীর মশাররফ হোসেন তার যুগের দাবী মিটাতে পারেন নি। সে চেষ্টা ও মানসিকতা তার ছিলনা। তবু তিনিই প্রথম মুসলমানদের জন্য সার্থক সাহিত্য রচনা করেছিলেন একথা অস্বীকার করা যায় না। বাংলা সাহিত্যে মুসলিম কবি সাহিত্যিকদের মধ্যে মীর মশাররফ হোসেনের নাম শীর্ষদেশে অম্লান হয়ে আছে একথা যেমন সত্য তেমনি সমগ্র বাংলা সাহিত্যেও তিনি একজন শ্রেষ্ট সাহিত্যিক ছিলেন একথাও অনস্বীকার্য। তার মৃত্যুঃ পদমদী, ১৯১২ সালে।

বাংলা একাডেমীর তত্ত্বাবধানে এখানে নির্মিত হয়েছে মীর মশাররফ হোসেন স্মৃতিকেন্দ্র। ২০০১ সালের ১৯ এপ্রিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। বাংলা একাডেমী এ কেন্দ্রের তত্ত্বাবধানের জন্য একজন সহকারী পরিচালকসহ ৫ জন কর্মচারী নিয়োগ করেছে।[দ্বীপ বিশ্বাস]

অবস্থান ও যাতায়াত

রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়নের পদমদী গ্রামে।


Total Site Views: 1005350 | Online: 6